পথচলার প্রেরণা

একবার এক প্লেন দুর্ঘটনায় একটি মাত্র লোক ছাড়া সবার মৃত্যু হয়। প্লেনটি ক্র্যাশ করে একটা দ্বীপে, নির্জনদ্বীপে। জনমানবহীন দ্বীপের চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। কিন্তু তাকে উদ্ধার করার মতো কোন জাহাজও আশেপাশে চোখে পড়ছিল না। দিনযায়, মাস যায়- লোকটি আশায় আশায় থাকে যে, কোনও জাহাজ হয়ত তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু আশায় আশায় শুধু দিন কেটে যায় তবু আশা পূরন হয়না। এদিকে একাকি দ্বীপে থাকার জন্য লোকটি ইতিমধ্যে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর তৈরি করে ফেলল আর সে ঘরের মধ্যে থেকেই সারাদিন শুধু সমুদ্রের পানে তাকিয়ে থাকে আর ভাবতে থাকে এই বুঝি কেও উদ্ধার করতে এলো। অবশেষে লোকটি শুধুদীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "সৃষ্টিকর্তা-তুমি দেখো"।  

 তো এর কদিন পরের ঘটনা। আজও লোকটি আগের মতোই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিন্তু বেলা যতো গড়াতে লাগলো লোকটির ততোই ক্ষুধা পেতে লাগলো। যা ফলমূল ছিল সবশেষ হয়ে গেছে! অগত্যা, লোকটি খাবার জোগাড় করতে কুটির ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে এবং বেশ কিছুক্ষণ পর যখন আবার খাবার নিয়ে কুটিরে ফিরে আসে, দেখতে পায় তার উনুনের জ্বালানো আগুন থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে তার ছোট্ট কুটিরে আগুন ধরে গেছে এবং আগুন প্রায় সম্পূর্ণ কুটিরটাকেইপুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলেছে! লোকটি আর সহ্য করতে পারেনা। সে প্রচণ্ডরাগে-ক্ষোভে আর দুঃখে চিৎকার করে বলে ফেলে, "হে ঈশ্বর! তুমি আমার থেকে আমার পরিবারকে দূরে সরিয়ে এই নির্জনে এনে ফেলেছো, এখন আবার আমার সামান্য কুটিরটাকেও তুমি জ্বালিয়ে দিলে; এমনকাজ তুমি কিভাবে করতে পারলে!!" কথাগুলো বলেই লোকটি কান্নায় ভেঙেপড়ে, এমনসময় দ্বীপের ধারে একটি ছোট জাহাজ এসে নোঙর ফেলে আর তার থেকে কিছু লোক বেরিয়ে এসে হারানো লোকটির কাছে এসে সাহায্য চায় কিনা জানতে চায়। লোকটি তখন কান্না থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, তারা তাকে কিভাবে খুঁজে পেল। জবাবে তখন জাহাজের লোকগুলো বলে, "আমরা দূর থেকে এইদ্বীপে আগুন আর ধুঁয়া দেখে বুঝে নিই কেও হয়তো সাহায্য চাইছে তাই এখানে এসেছি"। কথা গুলো শুনে লোকটি সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ পেয়ে বিস্মিত হয়ে যায়।সে বুঝতে পারে, "সত্যিই আজকে তার ঘরে আগুন না লাগলে এইদ্বীপ থেকে হয়তো কোনোদিনও সে ছাড়া পেতোনা!!" 
সৃষ্টিকর্তা মানুষের ভালোর জন্যই সবকিছু করেন কিন্তু মানুষ আমরাই ভুল করে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহকে অস্বীকার করি; দেখতে চাই না আসলে তিনি আমাদের জন্য কি রেখেছেন। ফলে অসন্তুষ্ট হয়ে গালমন্দ করতে থাকি নিজেদের ভাগ্যকে। সুতরাং সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকতে হবে, নিশ্চিত আমাদের সামনে হয়ত এমন কিছু অপেক্ষা করছে যা আমাদের জীবনটাকেই বদলে দেবে! একটু গুলতির কিংবা তীর এর দিকে খেয়াল করে দেখা যেতে পারে। তীর নিক্ষেপের জন্য এটিকে যত পিছনে টেনে আনব আমি তীর টি ঠিক ততটাই দূরে আঘাত হানতে সক্ষম হবে, অর্থাৎ এটি তত দূরের লক্ষ্যমাত্রায় আঘাত হানতে সক্ষম হবে। ঠিক স্বাভাবিক অবস্থান থেকে পতন যত গভীরে, স্বাভাবিক অবস্থান থেকে উত্থানও কমপক্ষে তত উচুতে। প্রকৃতি আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
“কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে”, তা আমরা কে না জানি! তাই বড় অর্জনের জন্য একটু বড় বড় ঢেউ আমাদেরকে সহ্য করতেই হবে। আর সেজন্যই আমাদের জন্য বিধাতার এই বার্তা, সতর্কতাস্বরূপ। তবে “পতন” কে আমি কিভাবে মূল্যায়ন করব আর কি সিদ্ধান্ত নিব সেটির মাধ্যমেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
একবার, ৮০ বছর বয়স্কা এক বৃদ্ধা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। প্রথম দিন ক্লাসে আসলে বৃদ্ধ বয়সে তার এমন পড়াশুনার প্রতি ঝোঁক দেখে সবাই তার কাছে জানতে চাইলো যে, এই বয়সে কেন তিনি এমনটা করলেন। বৃদ্ধা হাসিমাখা মুখে জানালেন, "আসলে আমার নামে কোনও একাডেমিক ডিগ্রী নেই। তাই আমার খুব ইচ্ছা একটা ডিগ্রী অর্জন করা আর তাই এ স্বপ্ন পূরন করতেই আমি ভার্সিটি ভর্তি হয়েছি”।

ক্লাসে সবাই বৃদ্ধাকে একজন অভিভাবক কিন্তু সুন্দর বন্ধু হিসেবে গ্রহন করে নিলো। বৃদ্ধা যেখানেই যেতেন সেখানেই তাঁকে সবাই তার জন্য শ্রদ্ধার সাথে আসন ছেড়ে দিত। সুযোগ পেলেই সবাই তার কাছে তার জীবন সম্পর্কে জানতে চাইতো। কিভাবে তিনি তার দীর্ঘ জীবন পার করেছেন, কিভাবে সকল বাঁধাকে উপেক্ষা করে আজ এতদূর আসতে পেরেছেন- এসব ব্যাপারে তার কাছে সবাই জিজ্ঞাসা করতো। দেখতে দেখতে ৪ টি বছর কেটে যায়। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হবার পর একদিন কলেজে অতীতের সকল ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে এক আনন্দসভা ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। আনন্দসভায় সেই বৃদ্ধাকে একটি ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। সকলের অনুরোধে বৃদ্ধা ভাষণ দিতে স্টেজে উঠতে গেলে হঠাৎপা পিছলে পড়ে যান। বৃদ্ধার এমন অবস্থা দেখে সবাই কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও বৃদ্ধা কারও দিকে না তাকিয়ে হাসিমুখেই ভাষণ দিতে শুরু করেন এবং শুরুতেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলে উঠলেন, “পড়ে গিয়েছিলাম বলেই এখানে উঠতে পেরেছি। যখন উঠতে চেষ্টা করেছি তখন আমার ধারনা হয়েছে এতো উঁচু জায়গার উপর আমি উঠতে পারবো না। ঠিক তাই হয়েছে- চেষ্টা করা মাত্র পড়ে গিয়েছি। আর যখনই পড়ে গিয়েছি তখনই মাথাই চিন্তা এসেছে আমি উঠেই ছাড়বো আর তাই উঠতে পেরেছি। তার মানে এখানে আমার জন্য পড়ে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তা না হলে উপরে ওঠার মতো মানসিকতার সৃষ্টি হতো না”। 
সুউচ্চ পর্বতে আরোহন করতে গেলে অবশ্যই প্রথম পদক্ষেপটা একেবারে নিচের দিকেই থাকে।“–উইলিয়াম শেক্সপিয়ার
সম্ভবতঃ এটি কাউকে আরো বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখার, সাহস করার এবং উদ্যোমী হওয়ার স্পৃহা যোগায়, তাই এই পিছিয়ে পড়া। আর এটাই সত্য। মাঝে মাঝে পিছিয়ে পড়াকে পিছিয়ে পড়াও বলেনা।যেমনটি “তীর” এর নিক্ষেপন থেকেই আমরা সেটি দেখতে পাই।
অনেককে দেখা যায় যে, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক ফলাফল খারাপ করে জীবনের সব “বৃথা” বলে আখ্যায়িত করতে। কেউ পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারছে না, কেউ পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারল না, তার থেকেই জন্ম নেয় রাজ্যের অনাস্থা, বিশেষত নিজের উপর। বিশ্বের ২৩তম ধনী, জ্যাক মা, হার্ভার্ড-এ ১০ বার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কে এফ সি যখন চায়নায় আসে, তখন ২২/২৩(এক্সাক্টি সংখ্যাটি মনে নেই) জন চাকরীর আবেদনকারীর মধ্যে সে-ই একমাত্র আবেদনকারী, যাকে নেওয়া হয়নি। পুলিশের চাকরির ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে তার জন্য। এবং এরকম অনেক রেকর্ড আছে মানুষের জীবনের। তো, জ্যাক মা যদি ওখানেই থেমে যেত যে, সে এতবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে হার্ভার্ড থেকে, কে এফ সি’র একমাত্র প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি হিসেবে, তাহলে আজকে আর তার আলিবাবা’র মতো বিশাল সম্রাজ্য গড়া হতো না। এমনকি যদি সে, ওসব ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাতও না হত, তবে সংশয় আছে হার্ভার্ড এর শিক্ষা দিয়ে অথবা কে এফ সি’র চাকরি দিয়ে আদৌ এরকম সম্রাজ্য গড়তে পারত কিনা। তাই, যেকোন ব্যর্থতা থেকে আমাদের উন্নতর কিছু প্রতিক্ষা করাটিই যথাযথ কাজ হবে।
বুয়েট এ পড়া, কারো জীবনের লক্ষ্য হতে পারেনা, এটি কেবলি লক্ষ্যে পৌছানোর একটি ধাপ মাত্র। তেমনি ভাবে, অন্যকোন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আইনস্টাইন এর একটি কথা মনে পড়ছে,
The one who follows the crowd will usually get no further than the crowd, The one who walks alone, is likely to find himself in places no one has ever been”
একেবারে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগের অভাব? তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখা যেতে পারে হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, এম আই টি, ইয়েল এর কয়জন শিক্ষক ওসব ভার্সিটি কিংবা ইন্সটিটিউট থেকে অনার্স করেছে? যে সংখ্যাটি আছে সেটি এই অভাববোধ করাকে যৌক্তিক দেখাচ্ছে না! দেখা যাবে ঐসব শিক্ষকদের অনেকে এমন ভার্সিটিথেকে অনার্স করেছে যেগুলো বিশ্বের টপ ২০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও নেই! যদি আমি কাছের কোন উদাহরন দেই, তবে চলে আসবে একজন প্রফেসরের কথা যাকে আমি চিনি, তিনি গওহর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, কিন্তু হার্ভার্ড সহ নামকরা অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতা করছেন। এছাড়া বহু মানুষ অনেক কম খ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেও বিশ্ব চষে বেড়াচ্ছেন। অসংখ্য পাওয়া যাবে।
এখন আমি বলতে পারি, আমার মেধা নেই। যেটির কারনে আমি নিজেকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে কিংবা তা বাস্তবায়ন করতে ভয় পাচ্ছি, সাহস পাচ্ছিনা। তবে তাই যদি হয়, মনেপড়ে নিউটনের একটি কথা, “If I am anything, which I highly doubt, I have made myself so by hard work” অতএব আমার মেধা না থাকার অভিযোগ মুহুর্তের মধ্যেই আসলে ধুলোই মিশে গেল, মানে এটি গ্রহনযোগ্য না। পরিশ্রম করে সব অতিক্রম করা যায়।
লেগে থাকা দরকার। এটি অন্যতম একটি পন্থা, সাফল্যের দিকে। আর হাল ছেড়ে দেয়াটা, স্বপ্নহারিয়ে যেতে দেয়াটি হচ্ছে জীবনযুদ্ধে পরাজিত হওয়া কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার ন্যায়। 
একবার এক শিক্ষক শিক্ষার্থিদেরকে যার যার জীবনের লক্ষ্য কি; সে ব্যাপারে লিখতে দিয়েছেন। ক্লাসের সর্বশেষ বেঞ্চে বসা ছেলেটি বসে শুধু ভাবছিল সে কি লিখবে। বেশ কিছুসময় পর ছেলেটি দশ পৃষ্ঠার একটি বিশাল নোট লিখে শিক্ষকের হাতে দিল। শিক্ষক বেশ কিছু সময় নিয়ে রচনাটি পড়ে তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন এমন উদ্ভট রচনা আর কখনও লিখবে না! ছেলেটি জানতে চাইলো সে এমন কি লিখেছে যার কারনে রচনাটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। শিক্ষক বললেন, "তুমি লিখেছ তোমার স্বপ্ন নাকি নিজস্ব একটা ঘোড়ার খামার দেবে, যেখানে পৃথিবীর সব দূর্লভ জাতের ঘোড়া থাকবে। এটা কি করে সম্ভব?! তোমার না আছে টাকা, আর না আছে তোমার বাবার বিশাল জমি যেখানে করবে ঘোড়ার খামার! তাই এমন আকাশ কুসুম না ভেবে ভালো কিছু ভাবো যেখানে তোমার ভবিষ্যৎগড়তে সমস্যা হবে না! সুতরাং তুমি আগামিকাল আবার তোমার জীবনের লক্ষের ব্যাপারে বাসা থেকে লিখে আনবে, আমি আগামিকাল আবার তা দেখবো"! শিক্ষকের মুখে এমন কথা শুনে ছাত্রটি তার বাড়িতে যেয়ে তার বাবাকে স্কুলের সব ঘটনা খুলে বলল। জবাবে বাবা বললেন, "যা কিছুই করো সেটা মন দিয়ে করো, অবশ্যই তাতে ফল পাবে"। বাবার মুখে এমন কথা শুনে ছেলেটি আবার রচনা লিখতে শুরু করলো এবং আগের মতোই সেই একই কথা লিখে নিয়ে পরদিন শিক্ষকের হাতে দিয়ে বলল, "আপনি ওটা আবার ছিঁড়ে ফেলতে পারেন, কিন্তু আমি আমার স্বপ্ন কখনই ভেঙ্গে ফেলবো না"!
এরপর কেটে যায় বেশ কিছু বছর। স্কুলে তখন পর্যন্তও সেই শিক্ষকটি কর্মরত কিন্তু সেই ছেলেটি পড়াশুনার পাঠ চুকিয়েছে অনেক আগেই। স্কুলের পিকনিকের সময় শিক্ষক তার ক্লাসের সকল ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে উপস্থিত হয় একটি অত্যাধুনিক পিকনিক কর্নারে। এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতেই দেখা হয় সেই ছেলেটির সাথে। শিক্ষক জানতে চান এখন সে কি করছে। জবাবে ছেলেটি বলল, “আমি অনেক কষ্ট করে ছোট্ট এক টুকরো জমি কিনেছিলাম, এরপর নেমে পড়ি ঘোড়া শাবকের সন্ধানে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমি ভালো সাড়া পেতে থাকি। এবং বর্তমানে আমার কাছেই রয়েছে সকল প্রজাতির মূল্যবান সব ঘোড়া যা বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্জিত আয় দিয়ে আমি তৈরি করেছি আরও বেশ ক’টি খামার, এমনকি এই পিকনিক স্পটটিও আমার তৈরি!”

এতক্ষণ বাদে শিক্ষক মুখ খুললেন আর বললেন,
"সত্যিই তুমি আমাকে মুগ্ধ করেছো! এতো বছরে আমি শত শত ছেলে মেয়েদের স্বপ্নকে কেড়ে নিয়েছি অথচ একমাত্র তুমিই তোমার স্বপ্নকে আগলে রেখেছ।তোমার আরও উন্নতি হোক-এই কামনাকরি”
তাই নিজের স্বপ্ন গুলোকে পিষে মারা উচিত না, কেড়ে নিতে দেওয়া যায় না! নিজের স্বপ্ন আর ইচ্ছা গুলোকে আগলে রেখেই চলার চেষ্টা করা উচিত। চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি, অপেক্ষা করতে শিখতে পারি, একাগ্রচিত্তে লেগে থেকে আর পাহারা দিয়ে রাখা উচিত নিজের ইচ্ছাগুলো, যেন অন্য কোনও মোহ বা লোভ এসে আমাদের স্বপ্নগুলোকে চিনিয়ে নিয়ে না যেতে পারে। পৃথিবীতে বহু উদাহরণ আছে সংকট থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছানোর উপর। আমাদের বড় হতেই হবে! কিসের অভাব আমাদের? সব কৃত্তিম অভাব। সব আছে, সব! আব্দুল্লাহ আবু সাইদ স্যার প্রায়ই বলেন, মানুষের মধ্যে একটি দৈত্য আছে, মানুষ এটির পথ উন্মুক্ত করে দিলেই পারে।
মাইকেল জর্ডান কে স্কুল কলেজ এর বাস্কেটবল টিম থেকে তাকে বিতাড়িত করা হয় শুধুমাত্র তার উচ্চতা আর নৈপুণ্যর অভাবের কারন হিসেবে। অথচ বাস্কেটবল চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় মাইকেল জর্ডানের নাম দেখা যাবে সকলের আগে । এ ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন-আমাকে বিতাড়িত করা হয় আর সেটাই হয় আমার সফলতার কারন কেননা আমি প্রমাণ করতে লেগে যাই- আমি করে দেখাবোই দেখাবো!! এনিড ব্লিটনের লেখা বই ১০০০ বারেরও বেশি বার প্রকাশক কোম্পানি থেকে প্রকাশ করতে অস্বীকার করে। পরবর্তীতে তার লেখা অ্যাডভেঞ্চার গল্প গুলোই হয়ে ওঠে গল্প রাজ্যের শ্রেষ্ঠ লেখা যার ফল বয়ে চলেছে আজও একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে।
এনরিকো কারুসো- যার ব্যাপারে গানের শিক্ষক বলেছিলেন-“তোমার গানের কণ্ঠ নেই, তোমার দ্বারা গান হবে না”।পরবর্তীতে নীরবে নিভৃতে আপন নৈপুণ্য প্রদর্শনে এনরিকো হয়ে ওঠেন বিখ্যাত অপেরা সঙ্গীতগায়ক।
ওয়াল্ট ডিজনিকে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল-“কোনও সৃজনশীলতা নেই” বলে।দমে না গিয়ে ওয়াল্ট ডিজনি নিজেকে প্রমাণ করতে কাজ করে চলেন নীরবে নিভৃতে, যার বর্তমান পরিচয় আর অবস্থান প্রায় সকলেরই জানা!
এভাবেই একে একে নাম বলা যাবে হাজার হাজার ইতিহাস দ্রষ্টার যাদের জয়গানের সূচনা হয়েছিল বিফলতা কে ধরে। “পারি-পারবো”- এমনটা যদি ভাবতে পারি আমরা, হতাশা আমাদের জন্য নয়!!
আপনি আমি কেন পারবনা? যা কিছু শিখছি তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। আপনার আমার মতো ক’জন আছেন যারা শিক্ষা পেয়েছে স্কুল-কলেজ কিংবা ভার্সিটি থেকে? অথচ সফল তারাও হয়েছে যাদের কেউ কেউ স্কুল,কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় এর গণ্ডি পার হতে পারেনি। “পল এলেন” বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেননি কিন্তু তিনি ছিলেন বিল গেটসের সাথে সাথে মাইক্রোসফটের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা একইসাথে ড্রিমওয়ার্কস স্টুডিও এর প্রতিষ্ঠাতা। “রিচার্ড ব্র্যানসন” স্কুল ছেড়ে ব্যবসায়ে মনোযোগ দেন এবং বিখ্যাত এয়ারলাইন্স কোম্পানি “আটলান্টিক এয়ারওয়েস” এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। “ল্যারি এলিসন” ‘ইলিওনয়েস” বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত হবার পর “শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে”ভর্তি হন তবু সেখান থেকেও তাকে ফিরে আসতে হয় কোনও এক অজানা কারনে।প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া-ই ল্যারি এলিসন প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বখ্যাত এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ সফটওয়্যার কোম্পানি “ওরাকল”। “জ্যাকটেইলর” কলেজ ছেড়ে ব্যবসায়ের দিকে নজর দেন এবং উন্নত বিশ্বের জনপ্রিয় “রেন্ট-এ-কার” সার্ভিস চালু করেন যা আজও চালু রয়েছে। এভাবেই একে একে নাম বলা যাবে সহস্র সব সফলব্যক্তিত্বদের নাম, যাদের ছিলনা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি কিংবা কোনও সার্টিফিকেট। পিয়ারসন এর ভাষায়-“ যদি উঠারজন্য একটা মই থাকে তবে আপনার উচিত হবে মইতে উঠে স্থানটা পার হওয়া অথচ তারাও পার হয়ে যায় যারা মই ছাড়া-ই লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে”। নিজেকে জানা প্রয়োজন, নিজের শক্তি সামর্থের উপর আস্থা রাখা প্রয়োজন। তারা যদি স্কুল-কলেজ না পেরিয়ে পারে তবে আপনি আমি এতসবের অভজ্ঞতা নিয়েও কেন পারব না? বলা হয়-
“শত্রুর শক্তির থেকেও নিজের শক্তি জানা আরও বেশি প্রয়োজন কেননা জয় আসবে আপন শক্তিতে, শত্রুর অসামর্থতায় নয়”,
“আপনি যদি নিজেকে দুর্বলভাবেন তবে আপনাকে সবল করার ক্ষমতা কারও নেই আবার যদি আপনি নিজেকে সবল করার চেষ্টা করেন তবে আপনাকে দুর্বল ভাবার ক্ষমতাও কারও নেই। এখন সিদ্ধান্ত আপনার- হয় নিজেকে দুর্বল ভেবে পরাজয় বরণ করুন নয় তো সবল হয়ে উঠতেআত্মনিয়োগ করুন।’ —বেভারলি সিলস
“যদি আপনি পরিশ্রমী হতে শেখেন তবে যেকোনওস্বপ্নই আপনি দেখতে পারেন আর নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনার স্বপ্নসত্য হবে।” —হেনরি ফোর্ড
“আপনাকে একমাত্র সেই হারাতে পারবে যে আপনার থেকে বেশিপরিশ্রম করবে, অথচ আপনি তাদের সবাইকেই পেছনে ফেলতে পারবেন যদি আপনি তাদেরথেকেও বেশি পরিশ্রম করতে পারেন।” —বেবরু
মেধা এবং পরিশ্রম দুটি আলাদা জিনিস। অনেকে বলে থাকবে মেধা ছাড়া উন্নতি অসম্ভব, আবার অনেকের মতে পরিশ্রমের সাথে সাথে মেধার উপস্থিতি থাকাটাও বাঞ্চনীয় ! তবে আমাদের কে আগে বুঝতে হবে মেধা কোন জিনিস।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ অলস্মিথ। চার বার নিউইয়র্কের গভর্নর হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। কলম্বিয়া এবং হাভার্ড সহ সেরা ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে! অথচ তার পড়ালেখার ব্যাপারে শুনলে আশ্চর্য হবেন। তিনি স্কুলের গণ্ডি ও পার হতে পারেননি! ইচ্ছা ছিল বড় রাজনীতিবিদ হবেন, তাই দিন রাত পরিশ্রম করে রাজনীতি ব্যাপারটাকে নিয়েই ভালোভাবে গবেষণা শুরু করেন যার ফলশ্রুতিতে তাকে নিউইয়র্কের প্রধান সরকারী বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
মূকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন। তাকে যখন বলা হলস্ক্রিপ্ট দেখে মুখস্ত করে অভিনয় করতে তখন তিনি সে অনুপাতেই অভিনয় করলেন। কিন্তু একবারও তা গ্রহণযোগ্য হল না। এবারে চ্যাপলিন নিজের বুদ্ধিমত্তার পরিচয়সূচক নিজের বানানো কাল্পনিক চরিত্র দিয়ে অভিনয় করলেন যা তাকে এনে দিল- “চার্লি চ্যাপলিন” খেতাব!!
সর্বক্ষেত্রে পরিশ্রমের ফলই সুফল বয়ে আনে। আমাদের বুঝতে হবে পরিশ্রম একটি ”উপায়” যার সাহায্যে যে কোনও কিছু আয়ত্ত করা সম্ভব। হতে পারে সেটা মেধা, কিংবা বুদ্ধিমত্তা। নিয়মিতচর্চা, পরিশ্রম করার সামর্থ্য আর সেই সাথে ধৈর্য- এই তিনটি জিনিসের সমন্বয় ঘটাতে পারলে যে কোনও কিছু আয়ত্ত করা তোমার জন্য কঠিন কিছু নয়। তবে সর্বদা মেধা-পরিশ্রম-বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায় না যাওয়াটাই মঙ্গল। কেননা, বলা হয়ে থাকে এর একটি অন্যটির দ্বারা সৃষ্টি।
 
“কলনেল সান্ডারস”- এর কথা মনে আছে তো? যিনি পৃথিবীবিখ্যাত KFC Restaurant এর প্রতিষ্ঠাতা।এই অসাধারণ ব্যক্তি কিন্তু একদিনেই সফলতা পাননি। তিনি তার সফলতার ব্যাপারে বলেন, “আমি প্রথম প্রথম মানুষের দ্বারে দ্বারে যেয়ে মুরগীর ফ্রাই বিক্রি করতাম। আমার মনে আছে আমার কাছ থেকে খাবার নেয়ার আবেদনে আমি সর্বমোট ১০০৯ বার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট থেকে “না” শব্দটি শুনেছি।পরে ১০১০ বারের বার আমি সফল হয়েছি”।
টমাস আল্ভা এডিসন যখন তার আবিষ্কৃত বৈদ্যুতিক বাল্বেরজন্য ১০০০ রকমের জিনিসের তৈরি ফিলামেন্ট ব্যাবহার করেও কোনও আলো জ্বালাতে পারলেন না তখন বিরক্ত হয়ে এডিসনের ব্যক্তিগত সহকারী বলে উঠলেন, “আমরা কিছুই করতে পারলাম না”। তার জবাবে এডিসন বলেছিলেন, “না, আমরা একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি; আমরা বরং আবিষ্কার করেছি যে পৃথিবীতে প্রায় ১০০০ রকমের জিনিস রয়েছে যা দিয়ে ফিলামেন্ট তৈরি করা সম্ভব নয়”।
(হঠাৎ হঠাৎ…) মনে হতেই পারে…”আমি পারবে না”।
মনে হতেই পারে…”বেঁচে থেকে কি লাভ”
মনে হতেই পারে…”সময় ফুরিয়ে গেছে”
মনে হতেই পারে…”অনেক ভুল করেছি”
মনে হতেই পারে…”আর কিছুই সম্ভব নয়”!!
এমনিভাবে হাজারো অনুশোচনা আর দুঃখবিলাস পূর্ণ কথা আমাদের মন অশান্ত করতেই পারে। “মনের কথা মনে এসেছে তাতে কবে কি হয়েছে”-এটা স্রেফ কবিতার লাইন হলেও বাস্তবে সত্যিই এমনটা হয়। মনের কথাগুলো মনেই গড়ে ওঠে আবার ইচ্ছা করলে মনের মাঝেই তাকে কবরও দেওয়া যায়। এটার জন্য প্রয়োজন শুধু একটু শক্ত মনোভাব আর একান্ত ইচ্ছা”। যে সময় চলে গেছে তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না- কথা সত্য। তবু যে সময় আছে তাতেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব। পূর্বের অনুশোচনা ভুলে যেয়ে নতুন করে শুরু করতে হবে।
“ডেল কার্নেগী” কে নিশ্চয় চিনে থাকবে- যিনি কিনা উদ্দীপনামূলক লেখনীর জন্য চীর উজ্জ্বল, চেনা পরিচিত। এই ডেল কার্নেগীর জীবনী যদি পড়ে থাকেন তাহলে দেখতে পাবেন তিনি বলেছেন, “আমি চাইতাম বিখ্যাত ব্যক্তিদের মতো সফল হতে; এর জন্য আমি অনেক পরিশ্রম করেছি কিন্তু আমি কোনভাবেই সফল হইনি, অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম- অন্যের মতো নয়- বরং আমি হবো “ডেল কার্নেগী”।
মূকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন- তিনি যখন প্রথম অভিনয় জগতে নাম লেখান তখন তাকে বলা হয়েছিল বিখ্যাত সবার অনুকরণ করে স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে অভিনয় করতে। চার্লি চ্যাপলিন বেশ কবার অভিনয় করার চেষ্টা করলেন কিন্তু কোনভাবেই সফল হতে পারলেন না, অবশেষে তাকে যখন অভিনয় করা থেকে ইস্তফা দিতে চাওয়া হল তখন তিনি বলেছিলেন, “আমাকে শুধু একটি বার আমার মতো করে অভিনয়করার সুযোগ দিন”। কর্মকর্তারা তার এই অনুরোধটুকু রক্ষা করলেন এবং চার্লি চ্যাপলিনের নিজের মতো করে করা অভিনয় থেকেই সারাবিশ্ব চিনে নিল- “চার্লি চ্যাপলিন আসলে কে”।
পড়েছিলাম কোথাও যেন যে, একবার এক যুবক সক্রেটিসের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলো, "সাফল্য লাভের রহস্য কি?” সক্রেটিস তাকে বললেন "পরদিন নদীর ধারে এসো, উত্তর বলে দেবো।" কথামতো যুবকটি পরদিন নদীর ধারে এসে সক্রেটিসের সাথে দেখা করে। সক্রেটিস তখন ছেলেটিকে সাথে করে নদীর ভেতর নামে। এরপর গলা সমান পানিরভেতর যেয়ে সক্রেটিস তখন ছেলেটির মাথা পানির ভেতর চেপে ধরে। এভাবে কিছু সময়ছেলেটিকে পানির ভেতর জোর করে চেপে রেখে তারপর তাকে উপরে তোলে। ছেলেটি তখনজোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলে, "আপনি এমনটা কেন করলেন?"।সক্রেটিস তখন জবাব দিল,"পানির ভেতর ডুবে থাকা অবস্থাই তুমি কিসের অভাববোধ করছিলে?"ছেলেটিউত্তর দেই, "বাতাসের"। সক্রেটিস বললেন,"প্রান বাঁচাতে যেমন তুমি বাতাসের জন্য মরিয়া হয়ে উঠছিলে, তেমনিভাবে সফলতা পাবার জন্যও তোমাকে অমন মরিয়া হয়ে কাজ করতে হবে। এটাই সফলতার আসল রহস্য, এ ছাড়া আর কোনও গোপন তত্ত্ব নেই।"
সাফল্য লাভের জন্য যদি নিজের ভেতর থেকেই সাফল্যের ক্ষুধা অনুভব না করা যায় তবে কখনোই সাফল্য পেতে আগ্রহ জন্মাবে না। প্রচণ্ডআগ্রহশীলতাই মানুষকে সফল হতে সাহায্য করে(বিশেষজ্ঞদের মতে)।
এক রাজা রাজ্যহারিয়ে একাকী ঘুরতে বেরিয়েছেন। সমুদ্রের তীরে ঘেঁষে ঘুরতে ঘুরতে রাজা দেখা পেলেন এক বালকের। বালকটি বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে একটা নৌকা বানানোর চেষ্টায় রত। রাজা তখন বালকটির কাছে যেয়ে জানতে চাইলেন তার অমন নৌকা বানানোর কারণ কী! জবাবে বালকটি বলল, আমাকে যুদ্ধের সময় তুলে নিয়ে এসেছে। সমুদ্রের ওপাশে আমার বাড়ি। আমি আমার মায়ের কাছে যেতে চাই। বালকেরকথা শুনে রাজা একেবারে “থ” হয়ে গেলেন। এই বিশাল উত্তাল সাগরকে পেছনে ফেলে বালকটি কিনা যেতে চাইছে তার মায়ের কাছে। রাজা এবারে তার বিশেষ কিছু সঙ্গীকে ডেকে ছেলেটিকে সমুদ্রের ওপাশে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এবারে রাজা ভাবতে লাগলেন, ছোট্ট ঐ ছেলেটির একার পক্ষে হয়তো সমুদ্র পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না কিংবা হয়তো পাড়ি দিতে পারতো। তবু ছেলেটি বসে না থেকে সমুদ্র পাড়ি দিতে মনস্থ করেছিল। কি অদম্য সাহস তার, অথচ রাজা হয়েও এমন রাজ্য হারা হয়ে তিনি ঘুরছেন অথচ একবারও হারানো রাজ্য জয় করার চেষ্টা করছেন না। এবারে তিনি তার বিশেষ কয়েকজন সহচরদের সাথে বৈঠকে বসলেন এবং কিভাবে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে আনা যায় তার পরামর্শ করতে লাগলেন। অবশেষে পরামর্শ এবং বুদ্ধি মোতাবেক শেষ-মেশ রাজা আবার যুদ্ধ করলেন এবং তার হারানো রাজ্য পুনঃরায় উদ্ধার করলেন।
উপরের গল্পটি আসলে কোনও মিথ্যা গল্প নয়, এটি ছিল ফরাসি সম্রাট ও সমর নায়ক নেপোলিয়ান এর ব্যাক্তিগত জীবনের সত্য গল্প। অনুপ্রেরণা কখন কোথা হতে আসে, কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কত ছোট্ট একটি ঘটনা কত বড় জয়ের জন্য অনুপ্রেরনা যুগিয়েছে।
চেষ্টা যারাই করেছেন তারাই সফল হয়েছেন,
অদম্য ইচ্ছা আর সাহস নিয়ে ইতিহাস রচয়িতারা দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে জয় করতে হয়। কাজে বাঁধা আসবে এটাই স্বাভাবিক, তবে যদি এগিয়ে যেতে পারেন তাহলে একসময় না একসময় সাফল্য অবশ্যই পাবেন। সাফল্য এমনকোনও বস্তু নয় যা কিছু মানুষের জন্যই সীমাবদ্ধ, বরং সাফল্য এমন এক সীমাবদ্ধজিনিস যা শুধু পরিশ্রমী আর ধৈর্যশীল মানুষের জন্যই অপেক্ষা করছে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় আকাশে ওড়ার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করতে লাগলেন। তারা এমন একটি যন্ত্র আবিস্কার করতে চাইলেন যা আকাশে উড়বে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এর এমনকথা পৌঁছে যায় সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট। দিনটা ছিল ১০ই ডিসেম্বর ১৯৩০। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এর জ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলে তৎকালিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা। পত্রিকায় ছাপা হয়তাদের “বিদঘুটে” চিন্তা ধারার উপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন। সেখানে বলাহয়- “রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এমন কিছু তৈরি করতে চাচ্ছে যা বাতাসের চেয়ে ওজনে হালকা আবার তা নাকি আকাশে উড়বে”! সবার মুখে মুখে কথাটা তখন কৌতুক সুলভ আচরনে পরিণত হল। কিন্তু ওদিকে, এই সংবাদ প্রকাশ করার মাত্র এক সপ্তাহ পরেই সকলের চোখে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে “কিটিহক” থেকে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্র নিয়ে আকাশে উড়ে যান, যার পরবর্তী কাহিনী প্রায় সকলেরই জানা।
রাইটভ্রাতৃদ্বয়ের সফল হবার স্বপ্ন কে কেউ মেনে নেয়নি। অথচ তারা করে দেখিয়েছেন- “এটা সম্ভব”।মানুষ তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেছিল অথচ তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল, “করে দেখাবোই”, আর সত্যিই তারা তা করে দেখিয়েছেন। একেই বলে সফল হবার নেশা যখন মানুষের কটু কথাও কর্ণে শ্রবণের সময় হবে না। লক্ষ্যটাই হল এখানে জরুরী, যার ফলাফল শুধু আপনি আমি-ই দেখতে পাব, অথচ আপনার স্বপ্ন কারও কারও কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে যারা নিজেরাই কোনও স্বপ্ন দেখতে জানেনা ফলে তারা থামাতে চাইবে তোমাকে, তোমাকে বানাবে হাসির খোরাকে। সুতরাং নিজের প্রতি বিশ্বাস আনতে হবে, চিন্তা করতে হবে যা করতে চাইছেন তা করতে পারলে সত্যি সত্যিই একটি কিছু বয়ে আসবে কিংবা ঘটে যাবে কোনও যুগান্তকারী ঘটনা।
বাবারপাশে ঘুমিয়ে রয়েছে তার ছোট্ট ছেলে। হঠাৎ ছেলেটির ঘুম ভেঙ্গে গেল। ছেলেটা তার বাবাকে বলল, “বাবা! আমি খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছি”! 

বাবা বললেন, “কি স্বপ্ন?” 

ছেলে বলল, “আমি দেখলাম- যুদ্ধ বেধে গেছে। মানুষজন সবাই ছুটে পালাচ্ছে। চারিদিকে শুধু হাহাকার।মানুষজন সবাই ভয়তে চিৎকার করছে”। 

বাবা বললেন, “তারপর?” 

ছেলে বলল, “তারপর দেখি যুদ্ধের ভেতর আমি একা একা দাড়িয়ে আছি। আমাকে সাহায্য করবার কেও নেই। একটু পর একটা প্লেন এসে বোমাবর্ষণ করলো, আমার পাশেই অনেকগুলোবোমা পড়লো। কি বিকটতার আওয়াজ! আমি ছুটে পালাতে যাবো ঠিক এমনসময় আমার ঘুমভেঙ্গে গেল!” 

ছেলে আবার বলল, “বাবা,আমি খুব ভয় পেয়ে ছিলাম”।

বাবা বললেন, “আমি জানি”।

ছেলে বলল, “তাহলে তুমি বুঝতে পেরেছিলে যে আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছি?” 

বাবা বললেন, “অবশ্যই”!! 

ছেলে বলল, ‘তাহলে তুমিই আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছ?” 

বাবা বললেন, “না, আমি তোমার ঘুম ভাঙ্গাইনি”।

ছেলে বলল, তাহলে আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছি জেনেও স্বপ্নের শুরুতেই তুমি আমার ঘুম ভাঙ্গাওনি কেন?” বাবা বললেন, “কারন তুমি যা দেখেছ ওগুলো স্বপ্নের ভেতর ছিল। কিন্তু বাস্তবেতো তুমি আমার পাশে খুব নিরাপদেই ছিলে!কিন্তু একটু পর তোমার স্বপ্নের ভেতরে তুমি যখন খারাপ অবস্থার ভেতর চলে গিয়েছিলে ঠিক তখনই নিজে নিজেই আবার স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়েছ”।

ছেলে বলল,‘তাইযদি হয় বাবা, তাহলে কি আমি সকল খারাপ অবস্থার ভেতরে ইচ্ছামত চাইলেই আমি আবার ভালো অবস্থানে ফিরে আসতে পারবো?” 

বাবা বললেন, “অবশ্যই পারবে!! তবে তার জন্য তোমার ফিরে আসার ইচ্ছা থাকা লাগবে”!!
পৃথিবীটা সত্যিই দুঃস্বপ্নে পরিপূর্ণ। এখানে যা কিছু চাইতে যাবেন, তাতেই দেখবেন দুঃস্বপ্নের মতো কিছু খারাপ জিনিস নিজের পিছু লাগবে। ওগুলো আপনাকে ছাড়তে চাইবেনা- বরং ওগুলো থেকে আপনার নিজেকেই সাবধানে থাকতে হবে। রাগ- ক্ষোভ- হতাশায় জীবন ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হবে- কিন্তু নিজে থেকেই যদি আবার ফিরে আসার ইচ্ছা পোষণ করো তাহলেই আবার ফিরতে পারবে আলোর পথে। জগতে ভালো-মন্দ যাই কিছু করি আমরা, তাতে নিজের স্বদিচ্ছা থাকাটাই হল গুরুত্বপূর্ণ। আর স্বদিচ্ছা যদি থাকে- তাহলে সফল হওয়াটাও খুব একটা কঠিন কিছু নয়! জীবন এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতাময়, পুরনো চিন্তা আর অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে এগুতে পারবেন না।
“জীবনটা একটি প্রতিযোগিতা। দৌড়ই হল এখানে একমাত্র খেলা। নিয়ম বলে এখানে কোনও কথা নেই, শুধু আপনাকে দৌড়াতে হবে। কেউ কেউ দৌড়ায় সামনের দিকে আর কেউ পেছন দিকে। এখন আপনি ঠিক করে নিন কোনদিক ধরে দৌড়াবেন। তবে খেলায় যখন নেমেছোঅবশ্যই তোমাকে জয়ী হতেই দৌড়াতে হবে আর সেই দৌড়টি হবে সামনের দিকে।” –জে.ডিইক১৮নভেম্বর,১৯৯৫।
 
"ইটঝাক পার্লম্যান"-আমেরিকান বিখ্যাত বেহালাবাদক; নিউইয়র্কের লিঙ্কন সেন্টারে জনসম্মুখে বেহালা বাজাতে স্টেজে উঠছেন। পোলিও রোগে আক্রান্ত পার্লম্যান চলতে ফিরতে দুটি ক্র্যাচের সাহায্য নেন!য থারীতি তিনি ক্র্যাচ-এ ভর দিয়ে অত্যন্ত কষ্ট ভারি মুখ নিয়ে স্টেজে উঠলেন। চেয়ারে বসতে কিছুটা সময় লাগলো। এরপর বেহালাখানা হাতে নিয়ে ঘাড়ের উপর ভর করে রেখে এবারে আস্তে আস্তে করে বাজাতে শুরু করলেন। উপস্থিত দর্শকশ্রোতারা তার বাজানোটা বেশ উপভোগ করছে ঠিক এমনসময় একটা কিছুর শব্দ হবার সাথে সাথেপার্লম্যান বেহালা বাজানো বন্ধ করে দিলেন।এরপর খানিকটা বিরতি নিয়ে আবার বাজানো শুরু করলে কিছুক্ষণ বাদে আবারও কিছু একটা শব্দ শুনে পার্লম্যানবাজানো বন্ধ করে দিলেন। এভাবে বেশ কবার এমন হল কিন্তু প্রতিবারই পার্লম্যানথেমে যাবার পর পুনঃরায় যখন শুরু করছিলেন তখন প্রতিবারি তিনি তার বেহালাতে নিত্যনতুন সুর সৃষ্টি করছিলেন যা উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করে দিচ্ছিল! কিন্তু দর্শকদের কেউই বুঝতে পারেননি যে পার্লম্যান কেন বারে বারে বিরতি দিচ্ছিলেন। এবারে তিনি যখন স্টেজ থেকে নেমে আসলেন তখন তার হাতে ছিঁড়া ফাটা বেহালা দেখে সবাই অবাক দৃষ্টিতে তারদিকে তাকিয়ে থাকে। পার্লম্যান তখন তাদের বিস্ময় ভাঙ্গাতে বলেন, "বেহালা বাজানো অবস্থায় বেহালার মাত্র তিনটা তার বাদে বাকি সবক’টা তার ছিঁড়ে যায়। ছিঁড়ে যাবার জন্যই স্টেজে তখন ছেঁড়ার শব্দ হয়েছিল। কিন্তু যখনি তার ছিঁড়ে যায় তখনই আমি চিন্তায়পড়ে যাই, এখন কিভাবে বাজাবো। কিন্তু আমি বেশীক্ষণ চিন্তা করার সময় নেইনি, আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেই – যে কটা তার ছিঁড়ে গেছে তা সারানো সম্ভব নয়, কিন্তু যে তিনটা তার অবশিষ্ট আছে তাই দিয়েই এমন শব্দের সৃষ্টি করতে হবে যেন ছিঁড়ে যাওয়া তারের অভাবটা এখন পূরণ হয়ে যায়। তাই সে অনুপাতেই আমি বাজাতে থাকি আর প্রত্যেক বার ভিন্ন ভিন্ন সুরের সৃষ্টি করি"। সবাই তখন পার্লম্যানের কথা শুনে করতালি দিতে থাকে। 
যা কিছু জীবন থেকে চলে গেছে বা মুছে গেছে তাকে আর ফেরানো যাবেনা, তবে যা কিছু আছে তাই দিয়েই এমন কিছু করা সম্ভব যার মাধ্যমে পেছনের জীবনের অনেক কিছুর অভাবই পূরণ হয়ে যায়। সফল হওয়া মানে একটা মাত্র জিনিসই আঁকড়ে ধরা নয়, বরং যে জিনিসে সম্ভব তাই গ্রহন করে সফল হবার চেষ্টা করা। উডি অ্যালেন এর ভাষায়-“যদি আপনি চলতে যেয়ে কয়েকবার পড়ে যান তবে বুঝবেন আপনি চালকের আসনেই রয়েছেন এবং এটাই সঠিক অবস্থান। কেননা হাঁটতে হাঁটতে যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ে যাবার ভয় থাকে, তেমনি ভাবে কাজের ফাঁকে একটু বিফল হতেই হবে। কেননা সফল হবার রাস্তাটা বিফল হবার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়”।
মায়া অ্যাঞ্জেলোর ভাষায়-“যাই কিছু ঘটুক, বিশ্বাস রাখতে হবে এটার শেষ অবশ্যই আছে তাই শেষ মুহূর্তের জন্যই আমাদেরকে খাটতে হবে”।
একই কথা বলেন জে.ডি.ইকবা-“কি ঘটছে সেটা কোনও ব্যাপার না, কি ঘটবে সেটাওকোনও ব্যাপার নয়, বরং আমরা নিজেরা নিজেদেরকে নিয়ে কি ঘটাতে যাচ্ছি সেটাই হলমূল ব্যাপার।”
অতএব আর নয় বসে থাকা, আর নয় হতাশা। আজ এই মুহুর্তে অর্থাৎ এক্ষুনি নতুন করে ভাবতে শুরু করি, নতুন করে নব উদ্দীপনা নিয়ে লক্ষ্যে পৌছাতে ঝাপিয়ে পড়তে হবে আর নয় পিছুটান, আবার আলোর পথে ধীর কিন্তু দৃড় পদক্ষেপ-এ এগিয়ে চলতে হবে। উন্নতি বা ইতিবাচক পরিবর্তন অল্প হোক কিন্তু তা যেন হয় ক্রমাগত বর্ধনশীল। এভাবেই অল্প-অল্প করে দেখবেন একদিন আপনার অনেকদূর পাড়ি দেওয়া হয়ে গেছে।
(বিঃদ্রঃ লেখাটি বিভিন্ন সংগৃহীত লিখা ও ঘটনা অবলম্বনে রচিত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *